1. admin@chunarughat24.com : admin :
ধর্ষণে মুগ্ধ জাতি কান্নায় বধির
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৮:২৭ অপরাহ্ন

ধর্ষণে মুগ্ধ জাতি কান্নায় বধির

আশরাফুল ইসলাম
  • সময় : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩৯২ বার পঠিত
ধর্ষণে মুগ্ধ জাতি কান্নায় বধির
ছবি। সংগ্রহ।

আশরাফুল ইসলাম।। বছর শেষে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে ধর্ষনের মোটা অংকের চিত্র না থাকলে আমাদের যেন মানায়ই না । সব কিছুতে যখন বেশী বেশী চাই তখন ধর্ষনের ঘটনায় পিছিয়ে থাকবে কেন? তাই হয়তো এখনো প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছেই।

অতি সম্প্রতি আজ ১৮ জানুয়ারী, শুক্রবার হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে এক কিশোরী। ধর্ষন করতে না পেরে জেল খাটায় জেল থেকে বেরিয়ে ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ড ঘটায় এক যুবক। ধর্ষণের সংবাদ ছাড়া সংবাদ পত্রের পাতা অপূর্ণ থাকে। ধর্ষণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক। অভিভাবক শিক্ষক প্রশাসন ও সমাজ কেউই পারছেন না এই বিকৃতি ও অধঃপতন ঠেকাতে। জেল জরিমানা সালিশ ক্ষতিপূরণ প্রদান ইত্যাদি নিয়মিত হলেও সামাজিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।

ধর্ষণ এর ঘটনা আমাদের সামাজিক সামষ্টিক ভাবমূর্তি স্পষ্ট করে দিয়ে এটাই বুঝাতে চায় যে , উন্নত রুচি ও সুশীলমনস্কতা যদি শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আমরা এর উল্টো দিকে শুধু নয় উল্টো স্রোতেও ভেসে যাচ্ছি। একথাও পরিস্কার বুঝা যায় যে, জাতি হিসাবে আমরা এখনো অগ্রযাত্রা শুরু করতে পারিনি। কিছু আধুনিক সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দ আমাদের মোহগ্রস্ত করে রেখেছে। আমরা দূর্বোধ্য শব্দ শুনেই আত্মহারা। ডিজিটাল আর আই সি টি শব্দ দুটো স্থুলস্খুল কান্ড বাধিয়ে দিয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত শব্দ গুলোর অর্থ ও মানে বুঝতে পারলাম না।

হুজুগ- অন্ধবিশ্বাস –অশিক্ষা এখনো ও আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ছে সমাজ। প্রানঘাতি সংক্রামকে আমরা সংক্রমিত। ধর্ষণের শিকার শুধুমাত্র ঐ শিশুটি-তরুনীটি-মহিলাটি নয়, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে পূরো সমাজ। আমরা শরীর নির্ভর জাগতিক জীবন যাপন করি বলে ঐসব ধর্ষণের ঘটনা আমাদের মনে প্রযোজনমত অনুভূতি সৃষ্টি করে না। তাই, আমরা নিজের শরীর বুঝি সামাজিক শরীর বুঝিনা । ফলে, ব্যক্তি ধর্ষণ বেড়েই চলছে।

অপূর্ণ শিক্ষা সামাজিক বিচ্যুতির মূলে প্রধান নিয়ামক হিসাবে কাজ করছে। দশ বছর ধরে স্কুল কলেজে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পাশ করে যাচ্ছে । সৃজনশীল শিক্ষা পদ্বতি চালু হলেও বন্ধ হয়ে গেছে মৌলিক সৃজনশীলতার চর্চা। মফস্বলের স্কুল কলেজগুলোতে খেলাধুলা নাটক কম্পিউটার ক্লাব ল্যাংগুয়েজ ক্লাব বিতর্ক সভা সাহিত্য সভা সঙ্গীত চর্চা ইত্যাদির মত পাঠ্যক্রম বহির্ভূত অথচ সর্বাগ্রে জরুরী বিয়যগুলো অপরিচিত থাকছে।চিঠি আবেদনপত্র মানপত্র নোটিশ ইত্যাদি বিষয় পরীক্ষা পাশের জন্য জরুরী ভিত্তিতে মূখস্থ করলেও বাস্তব প্রয়োজনের সময় এগুলো প্রয়োগে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ন অপারগ।

মোট কথা, সনদে ভাল ফলাফলের স্বীকৃতি থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্তঃসারশূন্যতা আমাদের নিরাশ করছে । উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বিগত ১০ বছরে উচ্চ মাধ্যমিক, কোন কোন ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করা শিক্ষার্থদের ৬০ ভাগ নিজের সম্পর্কে তথ্যাবলী লিখতে ও বলতে পারেন না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, স্নাতক সম্পন্ন করা ব্যক্তি নিজের নামও লিখতে পারেন না। দেখাদেখি করে লিখতে গিয়ে পরীক্ষার খাতায় বা আবেদনপত্রে অন্যের পিতা-মাতার নাম ও রোল নম্বরও লিখে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুল কলেজের বিভিন্ন আবেদনপত্র শিক্ষার্থী নিজেরা লিখে না বলে নিজের সম্পর্কে তথ্য দিতেও তারা ব্যর্থ। কোন কিছুই শিখছে না তারা। টাকা দিয়ে অশিক্ষা কিনছে সবাই। ফলে, মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশী তরুনরা মননশীলতা সৃজনশীলতা রুচিশীলতা ও ব্যক্তিত্বশীলতা অর্জনে পিছিয়ে থাকছে। অপূর্ন শিক্ষায় তথাকথিত তরুনরা রুচিহীনতায় ভূগছে আর অন্ধকারে পা বাড়াচ্ছে।

পাশাপাশি, ঘরেঘরে চলছে ষ্টার জলসা, জি বাংলা ষ্টার উৎসব, বাজারে বাজারে কম্পিউটার ভর্তি নীল ছবি ও নগ্নকামনা, শিক্ষাবোর্ড ভর্তি সনদের স্তুুপ, বিপনী বিতান দখল করা বিশ্ববিদ্যালয় আর মিথ্যা অহংকার আমাদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে, প্রজন্ম হয়ে উঠছে ধর্ষনোন্মুখ।

কর্মমূখী ও প্রায়োগিক শিক্ষার অভাব ও উদ্দেশ্যহীনতায় চারদিক বয়োঃপ্রাপ্ত, কিন্তু বখাটে। অযোগ্যতাজনিত কর্মহীনতা শক্তি যোগাচ্ছে অধঃপতনে । অনিয়ন্ত্রিত শারিরীক জীবন লাঞ্ছিত করছে মানবিকতাকে, উত্যক্ত করছে, খামছে ধরছে ধর্ষণ অভিপ্রায়ে । ধর্ষিত হচ্ছে আমাদের সোনাফলা উর্বর মাটি ও সময়। নিরীহ সৎ ও সেবাপরায়ন জাতি হিসাবে আমাদের সভ্যতাও কলঙ্কিত হচ্ছে ধর্ষকের কাছে।

মানসিক অপ্রকৃতস্থতা মানুষ মাত্রই স্বাভাবিক, কিন্তু এই অসুস্থতা জাতীয় ব্যাধিতে পরিণত হওয়া আশংকাজনক। সুশীল মনেবৃত্তি আইনও রীতিনীতিতে শ্রদ্বাশীল শিক্ষিত ব্যক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার বিপরীতে অদ্ভুত এক সামাজিকতায় ভর করে আমরা তৈরী করছি ক্রুর নৃশংস ছাত্রনেতা, ভাড়াটে খুনী, ঘুষখোর দূর্নীতিধার্মিক- চাকুরীজীবি, ভন্ড রাজনীতিক আর লম্পট ধর্ষক।

জীবনের মহত্বম লক্ষ্য নির্ধারন করতে এবং করে দিতে আমাদের সমাজ আজ পর্যন্ত ব্যর্থ তাই, সমাজকে নিয়ন্ত্রন করে প্রগতিশীল ধারা বইয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখানে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই নিঃসঙ্গ। চলমান পরিস্থিতি সচেতন ব্যক্তিকে বিরক্ত করে এমনকি হত্যাও করতে পারে। অশ্লীলতার রাজ্যে শ্লীলতা কামনা করাও অন্যায়। সংস্কার যেখানে বাধাগ্রস্ত, অপসংস্কৃতি যেখানে জনপ্রিয় সেখানে উন্নতি অসম্ভব আর ধর্ষণের মত সামাজিক পশুবৃত্তি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্ভ্রম নষ্ট করছে, জাতির ধর্ষক- সন্তানেরা কলংকিত করছে মাতৃভূমিকে। তাই, জাতি হিসাবে আত্মগৌরব রক্ষার্থে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ধর্ষণের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন মনোবৃত্তিকে প্রতিহত করা।

একটি ধার্ষণিক পরিসংখ্যানঃ বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যমতে ২০১৯ সালে ৫ হাজার ৪০০ নারী, এবং ৮১৫ টি শিশু ধর্ষণের মামলা হয়েছে। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০ টি এবং শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়ে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারীর মৃত্যু হয়। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে মৃত্যু হয়েছিলো ২১ নারী এবং ১৪ শিশু।

এছাড়া বাংলাদেশ শিশু ফোরামের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৮৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায়, ২০২০ সালের প্রথম ১০ দিনে দেশে ১২৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

আমরা বলতেই পারি, একটি সমাজে যখন দিনে- রাতে, মাসে, বছরে বা বছরের পর বছর ধরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে থাকে এবং এতে শিশু, তরুণী এমনকি বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হয় তখন তা ‘স্বাভাবিক প্রবণতা’ বলে গণ্য করা উচিত। মানে ঘটনা ‘অস্বাভাবিক’, ‘অন্যায়’, ‘অমানবিক’, কিংবা ‘অসভ্য’ হলেও যখন তা সংস্কৃতি হয়ে উঠে তখন তার সাথে সামাজিক কৃতিত্বও জড়িয়ে পড়ে। তবে এই সংস্কৃতি ও কৃতিত্ব দেশ ও সামাজিক প্রগতির একমাত্র অন্তরায়। মানসিকতাকে অবরুদ্ধ রেখে সামাজিক সমৃদ্ধি অসম্ভব। আমরা সকলের মঙ্গল কামনা করছি।

[২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সালে প্রকাশিত লেখা থেকে নেওয়া]


Facebook Comments
এ জাতীয় আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020-2021 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!