1. admin@chunarughat24.com : admin :
শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৬:২২ অপরাহ্ন

চুনারুঘাটে বুয়েটের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ড. এম এ রশিদের স্মরণসভা

মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম
  • সময় : শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪২৬ বার পঠিত
চুনারুঘাটে বুয়েটের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ড. এম এ রশিদের স্মরণ সভা

মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম।। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’র প্রথম উপাচার্য, দেশের প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকৌশলী বিষয়ে প্রথম পিএইচডি সম্পন্নকারী ও চুনারুঘাটের কৃতি সন্তান ড. এম এ রশীদ স্মরণে চুনারুঘাটে এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পদক্ষেপ গণপাঠাগারের আয়োজনে আজ শনিবার (২৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলা কমপ্লেক্সের পাঠাগার ভবনে উক্ত স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত।

ভার্চুয়ালি পাঠাগারের সভাপতি জনাব মোস্তফা মোরশেদ এর সভাপতিত্বে অর্থ সম্পাদক এসএম মিজানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পাঠাগারের সহ-সভাপতি হুমায়ুন কবির চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম জুয়েল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক সভাপতি মাজহারুল ইসলাম রুবেল, কাউসার খসরু, নুরুদ্দিন, আশিকুর রহমান ছামী, রেজওয়ানা ইসলাম উপমা, স্বাগতা পাল চৌধুরী।

চুনারুঘাটে বুয়েটের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ড. এম এ রশিদের স্মরণ সভা

ছবি। সঞ্চালনা করছেন এস এম মিজান।

এছাড়াও, উপস্থিত ছিলেন পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জাহিদুল হক রিপন, সিরাজুর রহমান তালুকদার সেলিম, হাবিবুর রহমান জলফু, রুবেল তালুকদার, তোফাজ্জল প্রমুখ।

বক্তারা ড. এম এ রশিদের কীর্তিময় জীবন তুলে ধরেন।

এছাড়া বক্তারা ড. এম এ রশিদ এর নামে চুনারুঘাটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ, স্থাপনার নামকরণ ও একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য চুনারুঘাট উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান।

শিক্ষাজীবনঃ ড. রশিদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাজারবাজার মধ্যবঙ্গ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৩৬ সালে তিনি হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ করে তিনি সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজে ভর্তি হন ও ১৯৩৮ সালে। সেখান থেকে বিজ্ঞানে প্রথম বিভাগে আই.এস.সি. পাশ করেন। পরে শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন।

১৯৪১ সালে পুরাকৌশল বিভাগে তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় পড়ালেখায় স্বীকৃতিস্বরূপ স্লেটার মেমোরিয়াল স্বর্ণ পদক ও টেট মেমোরিয়াল পদক পান।

১৯৪২ সালে তিনি এই কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে পুরাকৌশলে বি. ই. ডিগ্রী লাভ করেন এবং এই ফলাফলের জন্য ট্রেভর মেমোরিয়াল পুরস্কার ও পদক লাভ করেন।

১৯৪৫ সালে তিনি প্রকৌশল বিদ্যায় ভারত সরকারের ‘অল ইন্ডিয়া স্টেট স্কলারশিপ’ লাভ করেন এবং একই বছরের নভেম্বর মাসে এই বৃত্তিতে পড়ালেখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান।

১৯৪৬ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি পেনসিলভেনিয়ার পিটসবার্গে অবস্থিত কার্নেগি ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে (বর্তমান কার্নেগিমেলন বিশ্ববিদ্যালয়) পুরাকৌশল বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন ও ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরাকৌশলে এম.এস. (মাস্টার অব সায়েন্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ২৭ জুন ১৯৪৮ সালের তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. এসসি. (ডক্টর অব সায়েন্স) ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনঃ

অধ্যাপক এম এ রশীদ কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৪২-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আসাম সরকারের গণপূর্ত বিভাগে সহকারি প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে তিনি শিলচরে বদলী হয়ে যান এবং কাছাড় বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর অধীনে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন।

১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে তিনি ঢাকার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পুরাকৌশল বিভাগে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে তিনি অধ্যাপক হন এবং ১৯৫৪ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় ১৬ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৮ সালের ২৩ ডিসেম্বরে তিনি পাকিস্তান সরকারের জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য মনোনীত হন। ১৯৬১ সালের ১ এপ্রিল তিনি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রথম কারিগরী শিক্ষা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে তিনি নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত হন।

১৯৬১ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি কারিগরি শিক্ষা পরিচালকের দায়িত্বের অতিরিক্ত উপাচার্যের (খণ্ডকালীন) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কয়েক মাস পরে এই পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি ১ জুন ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পূর্ণকালীন) উপাচার্যের দায়িত্ব নেন।

১৯৬৬ সালের ১ জুন তিনি দ্বিতীয়বার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সরকারী কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ব্যাংককে অবস্থিত এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজীর আজীবন ট্রাস্টি হন।

১৯৭৫ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেন ও একই সাথে ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতি’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাকৌশল বিভাগে ব্যক্তিগত প্রফেসর পদে যোগ দেন।

১৯৮০ সালে তিনি জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যন পদে নিযুক্ত হন।

পারিবারিক জীবনঃ এম এ রশীদ ১৬ জানুয়ারি, ১৯১৯ সালে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার বগাডুবি (ক্ষিরতাই) গ্রামে জন্মগ্রহণ। তার পিতার নাম মুহম্মদ সা’দ। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম। ১৯৪১ সালে শিবপুরস্থ বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি মোসাম্মত্‍ তানজুন্নেসা খাতুনকে বিবাহ করেন। তিনি চার পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের পিতা।

মৃত্যুঃ

তিনি ৬ নভেম্বর ১৯৮১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২ বছর বয়সে মৃত্যবরণ করেন। তাকে তার গ্রামের বাড়ী হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বগাডুবিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

পুরস্কার ও সম্মাননাঃ কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি জীবনে অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৪১ সালে স্লটার মেমোরিয়াল স্বর্ণ পদক, ১৯৪১ সালে টেট মেমোরিয়াল পদক, ১৯৪২ সালে ট্রেভর মেমোরিয়াল পুরস্কার ও স্বর্ণ পদক, ১৯৬৬ সালে সিতারা-এ পাকিস্তান খেতাব এবং ১৯৮২ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার-র গুরুত্বপূর্ণ সম্মান লাভ করেন।

স্বীকৃতিঃ

১৯৮৪ সালের ২৮ জানুয়ারি বুয়েটের সহযোগিতায় “শুদ্ধতা, বিনয় ও ভক্তি” – এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ‘ড. রশীদ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করে। এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৌশল গোষ্ঠী ও মুক্ত সমাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত উদার উপলব্ধি, বোঝাপড়া ও যোগাযোগ স্থাপন করা এবং একই সাথে শিক্ষা ও প্রকৌশল পেশার মধ্যে অধিকতর বিনিময়, সমন্বয় ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বজায় রাখা।

ড. রশীদ ফাউন্ডেশন-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সম্মানসূচক ‘ড. রশীদ চেয়ার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এই ফাউন্ডেশন-এর অন্যান্য কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে ড. রশীদ স্মরণ বক্তৃতা এবং ড. রশীদ অ্যাওয়ার্ডসমূহ যার মধ্যে রয়েছে ড. রশীদ ফেলোশীপ এবং সেরা পিএইচডি থিসিসের জন্য ড. রশীদ স্বর্ণপদক।

ড. রশীদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্থাপত্য অনুষদে মেধার ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘ড. রশীদ অ্যাওয়ার্ড’ ও প্রকৌশল অনুষদে গরীব ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘ড. রশীদ স্কালারশিপ’ নামে বৃত্তি দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং শিক্ষকতায় যথার্থ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সেরা শিক্ষক হিসেবে মনোনীত শিক্ষককে ‘ড. রশীদ গোল্ড মেডেল’ নামক সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তাঁর স্মরনে বুয়েটে এক ছাত্র হল (এম এ রশীদ হল) নামকরণ করা হয়।

সমাজের একনিষ্ঠ সেবক, সর্ব গুণে গুণান্বিত এই মহাপুরুষের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।


Facebook Comments
এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!