1. admin@chunarughat24.com : admin :
যদি আর বাঁশি না বাজেঃ রিক্তের বেদন
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৮:৫১ অপরাহ্ন

যদি আর বাঁশি না বাজেঃ রিক্তের বেদন

আশরাফুল ইসলাম
  • সময় : বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ২৯৯ বার পঠিত
যদি আর বাঁশি না বাজেঃ রিক্তের বেদন

আশরাফুল ইসলাম।। জাতীয়(!) কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন লিখতেন, তার জবাব পাওয়া যায় কবির “আমার কৈফিয়ৎ” কবিতায়, যেখানে বলেন- “রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা, তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা”।

লেখার উদ্দেশ্য সফল হয়নি বলেই হয়ত ১৯৪২ সাল থেকে কবি নীরব অভিমানে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েন নজরুল। তিনি শুধু লিখেছেন, কিংবা পেশাদার লেখক ছিলেন তাও নয়। কবি-গানে- রণে-জীবনে একটাই চরিত্র- কাজি নজরুল ইসলাম।

সাধারণত, কবিকে ‘জাতীয় কবি’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু, জাতীয় কবির মর্যাদা সাংবিধানিক স্বীকৃতি নয় বলে এই মুহূর্তে মহান কবিকে আমার মহা ‘মহাবৈশ্বিক কবিরূপেই দেখবো। যেসকল মহান কবি-সাহিত্যিকের জীবনে মিশেছি, তাদের সবার সমন্বিত ছবি একটাই। মহাকবি নজরুলের পরবর্তী সময়ে যত গুণীর জীবনে গিয়েছি সেখানেও মানচিত্রও ওই একটাই।

বলতে আমার ব্যক্তিগত ধারণামতে, কবির শেষ অভিভাষণ “যদি আর বাঁশি না বাজে”- এ কবির মৌনতার আগাম ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ দেশের সকল নামকরা সাহিত্যিক, বুদ্ধিবিক্রেতা, অধ্যাপক ইত্যাদিরা কাজী নজরুল’র “জাতীয় কবি” কিনা তা নিশ্চিত করতে পারেন নি, তাঁরা আমার ধারনার ধারে-কাছেও নেই; বরং কবির স্মরনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হতে পারেন কিনা তা নিয়ে মগ্ন।

১৯৪১ এর ৬ এপ্রিলে, কলকাতায় “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি”র রজত জয়ন্তী উৎসবের সভাপতি হিসাবে যে অভিভাষণ দান করেন সেটিকে “যদি আর বাঁশি না বাজে” শিরোণামে প্রকাশিত হয়। অনুষ্ঠানটি কলকাতার মুসলিম ইন্সিটিউটে অনুষ্ঠিত হয়। সম্বর্ধিত কবির অভিভাষণের শেষাংশে বলেন-

“তোমাদের পাণে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিবনা
কোলাহল করি সারা দিনমান আর কারো ধ্যান ভাঙ্গিবনা
নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী
গন্ধ বিধুর ধুপ”।

এর পর ১৯৪২ থেকে কবি নজরুল মৌনী জীবন শুরু করেন। যদিও, কবি, দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন বলে প্রচার করা হয়। বিশ্বের সেরা সেরা চিকিৎসক, কবিরাজ, বিজ্ঞানীরা কবির রোগ শনাক্ত করতে পারেন নি। শেষ পর্যন্ত “পিকস ডিজিজ” বলে বিবেচিত রোগেই কি আক্রান্ত হয়েছেন না কি ওই মৌনতা “যদি আর বাঁশি না বাজে” অভিভাষণের বাস্তবরূপ ছিল?

অভিভাষণে বলেন, “আমি কবি হতে আসিনি, নেতা হতে আসিনি, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলিম। সেই প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম”। চিরবিদায়ের কথা বললেও, কবি তখনও মৃত্যুবরণ করেন নি। তবে, তার কবিসত্তা লোকান্তরিত হয়েছিল।

শেষ অভিভাষণের পর পয়ত্রিশ বছরকাল বেঁচে থাকলেও কোন কথা বলেননি, কিছুই আর সৃষ্টি করেননি। কবিকে নিয়ে টানাহেচড়া হবে, বড় বড় সভা হবে, জ্বালাময়ী বক্তৃতা হবে ইত্যাদি লোকদেখানো আয়োজন যে হবেই তা কবি ভাষণেই উল্লেখ করে গেছেন। তাই, কবির সুহৃদ বন্ধুর নিকট কবির মিনতি- ” এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে বন্ধু তুমি যেন যেওনা..”।

১৯৭২ সালের কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা(!) ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের ভাঁড়ামি কবির জীবনের শেষ প্রহসন বললে ভুল হবে না।

আর যাই হোক, শেষ জীবনে কবি কৌতুকের জলসায় নীরব থেকেই একান্তে উপভোগ করেছেন তাকেঁ ও তাঁর খ্যাতিকে ব্যবহার করার হীনমন্যতা। এবং, কবির আগাম বার্তার বাস্তবতা দেখে গেলেন। নজরুল জন্ম- মৃত্যু বার্ষিকী পালনে, শোভাযাত্রায় আমরাও দেখছি।

বাংলা ভাষা সাহিত্যের আরেকজন বিদগ্ধ লেখক হুমায়ূন আজাদ তাঁর “কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ” উপন্যাসে, আততায়ীদের সাথে টেলিফোন সংলাপে বলেন যে, তিনি আসলেই লিখতে চান না, তিনি তাদেরকে লাথি দিতে চান। তেমনি, শুধুই বিনোদিত করা লেখার উদ্দেশ্য হতে পারে না। চেতনা, দ্রোহ ও সাহস প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার বাহন হিসাবে বিনোদনের গুরুত্ব রয়েছে ; একটি গানে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তীঃ-
“এই যে রক্ত-ঘামে লেখা, যায় কি যায় কি কিছু শেখা?
এই কান্নাঘাম, পাবে কি দাম, নাকি অন্ধের ছুঁয়ে দেখা
এই মূর্খের দেশে গাওয়া ন্যাকামী বোকামী…..”।

বাংলাদেশের বড় লেখক প্রতিষ্ঠা আর পুরস্কার প্রত্যাশী। আর, ছোট বা উঠতি লেখকেরা তরুণ স্বপ্নদ্রষ্টা। দেখা যায়, চিহ্নিত কয়েকজন কবি, নাট্যকার, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অভিনেতা সারাবছরের সকল পদক, সম্মাননা পেয়ে থাকেন। আর, নবীন লেখকেরা তা দেখে এবং প্রচার করে তৃপ্ত। কোন মাধ্যম, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান অপ্রতিষ্ঠিত কবি- লেখকের দিকে ফিরেও তাকায় না। কারণ, একজন এমিরেটাস, একজন অমিকাস কিউরী কিংবা  এশিয়াটিক সোসাইটিকে পুরস্কার প্রদানে যে বিনিয়োগ হয়, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তা রিটার্ন হয়।

সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পত্র-পত্রিকা গুলো ব্যস্ত থাকে- এটা বানিজ্যিক- সারকুলেশনের ব্যাপার। যেমন, গেল ডুব, আসলো উবার-সিএনজি। এখন চলছে রোবটিক গল্প; তাও ওটা হিজাব পড়বে না কি বস্ত্রহীন থাকবে- রকমের স্থুল জিজ্ঞাসা। হট কিংবা বাজারি বিষয় নিয়ে ব্লগে যখন মাতামাতি দেখি তখন লেখকের লেখালেখি করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন জাগে, এ শুধু কিসের দিন?

গণজাগরণ(!) মঞ্চের সেই রম্য দিনে যেসব ব্লগারকে হত্যা করা হয় তারাও স্থুলতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন কি না আমার জানা নেই। তবে, তারা যে অযথা মৃত্যুবরণ করলেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। যে মাধ্যমে হোক, যেরকমই হোক এদেশে লেখকের সংখ্যা বাড়ছে বই কমছে না;  অনেকই আজকাল লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ উপন্যাস, কেউবা গল্পের বই লিখে ফেলেছেন,। অবস্থা এমন, যেহেতু তারা নিজেরাও কবি-লেখক, সেহেতু তারা নিজেই নিজেদের প্রিয় কবি।

অতএব, সকল লেখকই লাভের জন্য লেখালেখি করেন; তিনি হতে পারেন আমাদের গাও-গেরামের ছন্দলেখক কিংবা জাতীয় মর্যাদাপ্রাপ্ত মেট্রোলেখক। কর্পোরেট কিংবা মেট্রোরা যেকোনভাবেই হোক, লাভ না করে ঘরে ফেরেন না; পদক কিংবা পুরস্কার যেকোনো একটি নিয়েই ঘরে ফিরেন। সময়টাও এমন যে, কবিতার চেয়ে কবির, শিল্প নয় শিল্পির কদর বেশী।

লেখা আর প্রতিবাদের ভাষা নয়, আত্ম-প্রচার ও পুরস্কার লাভের কৌশল; লেখা দ্রোহ- বিদ্রোহ নয়, আপোষের সাজানো রূপ; স্বৈরাচারের বিরোধিতা কিংবা পতন নয়, সাধন পূজার মন্ত্র। এই অবস্থা চলতে থাকলে লিখে কি লাভ? তাই, কবি নজরুল আর লিখেননি।


Facebook Comments
এ জাতীয় আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020-2021 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!