1. admin@chunarughat24.com : admin :
শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৫:৫১ অপরাহ্ন

কমরেড মুজাফফর আহমেদ এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আশরাফুল ইসলাম
  • সময় : শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ২৪৯ বার পঠিত

আশরাফুল ইসলাম।। কমরেড মুজফফর আহমদ। বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিবিদ, একজন বিপ্লবী, ভারতবর্ষে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার অন্যতম সদস্য, কমিউনিষ্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, কুসংস্কার বিরোধী। তাঁকে ‘কাকাবাবু’ নামে সবাই ডাকতেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন বন্ধু।

১৮৮৯ সালের ৫ আগস্ট কমরেড মুজফফর আহমদ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের মুসাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মুন্সি মনসুর আলি সন্দ্বীপের আদালতের একজন আইনজীবী ছিলেন। মা চুনা বিবি।

তাঁর বর্ণমালার হাতেখড়ি বাবার কাছে। তারপর মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কাছে শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ শেষ করেন। ডেপুটি স্কুল ইন্সপেক্টর উমেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত মুজফফর আহমদকে ইংরেজি পড়ার জন্য উৎসাহ দেন।

১৯১৩ সালে তেইশ বছর বয়সে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন।

১৯১৩ সালে হুগলি কলেজে আইএ ভর্তি হন। ছাত্র পড়িয়ে নিজের খরচ ও পড়াশুনার খরচ যোগাতেন। এ ছাড়া তাঁর বড় ভাই কিছু টাকা দিতেন। হুগলিতে পড়াশুনার সময় তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতা চলে যান। তারপর কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন।

১৯১৫ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন।

১৯১৭ সালে যোগ দেন বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেসের সহকারী স্টোর কিপার পদে। এক বছর ছিলেন। মাসিক বেতন ছিল ত্রিশ টাকা। এরপর তিনি মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে গভর্নমেন্টের হোম ডিপার্টমেন্টে উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদকের কাজ করেন। এখানে তিনি মাত্র একমাস কাজ করেন। পরবর্তী একমাস কলকাতায় স্কুল পরিদর্শকের অফিসে কাজ করেন।

১৯১৮ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সার্বক্ষণিক কর্মী হন। তিনি উদ্যোগী হয়ে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে ষাট টাকা ভাড়ায় সমিতির কার্যালয় স্থাপন করেন। এই সময় ত্রৈমাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ বের হত। পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের নাম ছাপা হলেও সম্পাদকীয়র সব কাজ মুজফফর আহমদই করতেন।

১৯১৯ সালে জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিলে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজফফর আহমদ-দুজনের মাঝে সুসম্পর্ক ছিল। দুজনের জীবনকেই কমিউনিষ্ট প্রভাবিত করে। পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে মুজফফর আহমদ-এর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কবি নজরুলের চেয়ে মুজাফফর ছিলেন দশ বছরের বড়।

১৯১৮ সালে সমিতির উদ্যোগে বের হয় “বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা”।

১৯১৮ সালে সমিতির সব সময়ের কর্মী হিসেবে তিনি এর অফিসেই থাকা শুরু করেন। তিনি ছিলেন সমিতির সহকারী সম্পাদক। পত্রিকার কাজ পরিচালনার সময় চিঠিপত্রের মাধ্যমে তার কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে পরিচয় হয়।

১৯২০ সালের শুরুতে স্থির করে ফেলেন যে রাজনীতিই হবে তাঁর জীবনের পেশা। রাজনীতিক সভা-সমিতি ও মিছিলে যোগ দেওয়া শুরু করেন।

১৯২০ সালের শুরুর দিকে ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হলে নজরুলের সৈনিক জীবনের অবসান ঘটে এবং তিনি কলকাতায় চলে আসেন। তিনি কলকাতায় কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সাথে সাহিত্য সমিতির অফিসে থাকতে শুরু করলেন। এসময় মুজফফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করেন। ওই সময় শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফতের একজন অন্যতম নেতা। মুজফফর আহমদ তাঁর কাছে একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাব দেন। তিনি সম্মতি প্রদান করেন।

১৯২০ সালের ১২ জুলাই একে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’-এর যুগ্ম সম্পাদক হন মুজফফর আহমদ। সম্পদক ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথমে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও পরে মুজফফর আহমদ ‘নবযুগ’ ছেড়ে দেন। কিছুদিন পর পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা পৃথিবীতে একটা নব জাগরণ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব ভারতবর্ষেও পড়ে। এসময় মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলকাতা টাউন হলে পরপর তিন দিন ছয় ঘন্টা করে বক্তৃতা করেন। মুজফফর আহমদ সেই বক্তৃতা শুনে প্রভাবিত হন।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যে বিপ্লব হয়, তাঁকে প্রভাবিত করে। রুশ বিপ্লবের কিছু কিছু তথ্য প্রচারমূলক বই ও মার্কসবাদী সাহিত্য গোপন পথে এদেশে আসতে শুরু করে। মুজফফর আহমদ তা পাঠ করে মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার মতাদর্শের সন্ধান পেয়ে তিনি সেই পথের অভিযাত্রী হয়ে যান।

১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট পর্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্যোক্তা ছিলেন এম এন রায়। এই সময় মুজফফর আহমদ আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং বিদেশ থেকে অনেক পত্রপত্রিকা সংগ্রহ করতে থাকেন।

১৯২১ সালে এ পার্টি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এর অনুমোদন পায়। এই প্রবাসী পার্টির কাজ জার্মানিতেও সম্প্রসারিত হয়। ১৯২১ সালের শেষ দিকে কমিউনিস্ট সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। একই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় আরো কয়েকজন মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন। তাঁদের সাথেও মুজফফর আহমদের যোগাযোগ হয়। তাঁরা হলেন, মুম্বাই-এর শ্রীপদ অমৃত ডাঙ্গে, মস্কো থেকে কাবুলে আগত মোহাম্মদ আলি, পেশোয়ার ইসলামিক কলেজের অধ্যাপক গোলাম হোসেন।

১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে মাদ্রাজ, বোম্বাই ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপের সঙ্গে মুজফফর আহমদ যোগাযোগ করার কাজ শুরু করেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম মুদ্রিত ইশতেহার প্রচার করা হয়। আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের প্রতিনিধিদের সম্বোধন করে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দিয়ে এই ইশতেহার রচিত হয়।

১৯২২ সালের ১৫ মে পার্টির প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নাম ছিল ‘দি ভ্যানগার্ড অব দি ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স’। পুলিশের নজর পড়ায় নাম বদলে হয় ‘অ্যাডভান্স গার্ড’। তারপর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হিসেবে ‘দি ভ্যানগার্ড’ প্রকাশিত হয়। এই সময়কালেই নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় দ্বৈপায়ন ছদ্মনামে দেশের রাজনৈতিক সমস্যা এবং কৃষক ও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে মুজফফর আহমদ বিশ্লেষণাত্মক রচনা লেখেন।

ভারতবর্ষের ভিতরে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন প্রসঙ্গে মুজফফর আহমদ বলেন, ‘আগে পরে চার জায়গায় ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজ আরম্ভ হয়েছিল। উদ্যোক্তারা একত্রে মিলিত হয়ে আলোচনা করে যে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা নয়, প্রত্যেক জায়গায় পৃথক পৃথকভাবে উদ্যোক্তারা কাজ শুরু করেছিলেন। তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের পরিচয় ছিল না। ভারতবর্ষ একটি বিশাল দেশ। প্রথম চারটি জায়গা হলো কলকাতা, বোম্বে (মুম্বাই), লাহোর ও মাদ্রাজ। এক জায়গা হতে অন্য জায়গার দূরত্ব এক হাজার মাইলেরও অনেক বেশি। এত দূরে থেকেও আমরা সারা ভারতের পার্টি গড়ার কাজে নেমেছিলাম। কারণ কমিউনিস্ট আন্দোলন আন্তর্জাতিক। আমাদের সকলের মধ্য বিন্দু ছিল কমিউনিস্ট ইন্টান্যাশনাল। তার কেন্দ্র ছিল বহু হাজার মাইল দূরে মস্কোতে। কমিউনিষ্ট ইন্টারন্যাশনালই কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের একজনের সঙ্গে অপরের পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিলেন’।

১৯২২ সালের শেষ দিকে মস্কো থেকে কলকাতায় প্রত্যাগত শওকত ওসমানির সাথেও মুজফফর আহমদের পরিচয় হয়। এসময় ভারতবর্ষে যাঁরা কমিউনিজম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন তাঁদের সাথে মুজফফর আহমদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

১৯২২ সালের শেষের দিকে আব্দুল হালিমের সঙ্গে মুজফফর আহমদের দেখা হয়। দু’জনে মিলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজ শুরু করেন। প্রথম যুগে এঁদের সঙ্গে ছিলেন আব্দুর রেজ্জাক খান।

১৯২৩ সাল থেকে মুজফফর আহমদ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। পূর্বে জড়িত হয়েছিলেন ইন্ডিয়ান সীমান্ত এসোসিয়েশনের সঙ্গে। তখন থেকেই গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করে।

১৯২৩ সালের ১৭ মে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে রাজবন্দি হিসেবে কারাগার আটকে রাখে। ওই সময় ভারতবর্ষের পেশোয়ারে প্রথম কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা চলছিল। ওই মামলায় মুজফফর আহমদকে জড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু প্রমাণ না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কানপুর কমিউনিস্ট (বলশেভিক) ষড়যন্ত্র মামলায় মুজফফর আহমদ, শ্রীপদ আমৃত ডাঙ্গে, শওকত ওসমানি ও নলিনী গুপ্তের চার বছর করে সাজা দেয়া হয়।

১৯২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি কৃষকদের মাঝে কাজ শুরু করেন। সংগঠিত করেন কৃষকদের।

১৯২৫ সালের ১ নভেম্বর কলকাতায় ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ গঠিত হয়।

১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলন তাঁর উদ্যোগে হয়েছিল। ওই সম্মেলনে ‘মজুর-কৃষক পার্টি’ গঠিত হয়। প্রথমে ‘লাঙল’ নামে ‘মজুর-কৃষক পার্টি’র পক্ষ থেকে পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট থেকে ‘গণবাণী’ সাপ্তাহিক প্রকাশিত হতে থাকে। এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে মুজফফর আহমদের উপর।

১৯২৭ সালে কলকাতায় ডক-মজুর ধর্মঘট, মেথর ধর্মঘট, চটকল মজুর ধর্মঘটে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন।

১৯২৭ সালের ৩১ মে বোম্বেতে কমিউনিস্টদের এক সম্মেলনে মুজফ্ফর আহমদ যোগদান করেন।

১৯২৮ সালের ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর কলকাতায় সর্বভারতীয় ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। তিন দিন আগে ঝরিয়ায় অনুষ্ঠিত এআই টি ইউ সি’র অধিবেশনে প্রতিনিধিদের ভোটে কমরেড মুজফ্ফর আহমদসহ তিনজন কমিউনিস্ট সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯২৯ সালের ২০ মার্চ ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেফতার করে। এসময় মুজফফর আহমদকেও গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ‘মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়। এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয় ৩১ জনকে। চার বছর ধরে চলে এ মামলা।

১৯৩৩ সালের ৯ জানুয়ারি মামলার রায় হয়। মুজফফর আহমদকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। পরে আপিলে এ সাজা কমিয়ে ৩ বছর করা হয়। তিন বছর মীরাট, নৈনি, আলমোড়া, দার্জিলিং, বর্ধমান এবং ফরিদপুর জেলে ছিলেন। জেল থেকে মুক্ত হবার পর তাঁকে নজরবন্দিতে রাখা হয়। প্রথমে ফরিদপুর, পরে নিজের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে ও মেদিনীপুরের এক গ্রামে তাঁকে অন্তরীণ রাখা হয়। ব্রিটিশ সরকার সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের দমনের জন্য ‘বেঙ্গল অর্ডিনান্স’ আইন চালু করেছিল, সেই আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

১৯৩৬ সালের ২৫ জুন কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর পার্টিকে সংগঠিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। যে সব বিপ্লবী কর্মী কারামুক্ত হয়ে আসেন, তিনি তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে বিভিন্ন জেলায় পার্টি গঠনের ব্যবস্থা করেন।

১৯৩৬ সালে ‘গণশক্তি’ পুনঃপ্রকাশ করেন এবং এরপর ‘আগে চলো’ পত্রিকা প্রকাশ করেন।

১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে যুক্তবঙ্গের ২৮টি জেলাতেই কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন। পার্টির সভ্য সংখ্যা আড়াই থেকে তিন হাজারে উন্নীত হয়।

১৯৩৯ সালে সুরেন দত্তের সহায়তায় ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’ প্রকাশনাকে পার্টির আওতায় আনেন।

১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর বৃটিশ সরকার আবারও কমিউনিস্টদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে। এ সময় কলকাতার শ্রমিকদের মাঝে মুজফফর আহমদের খুব প্রভাব ছিল। যার কারণে সরকার ওই বছর ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁকে কলকাতা ছেড়ে যাবার আদেশ দেয়। আদেশ অমান্য করায় তাঁর এক মাসের জেল হয়। মুক্তি লাভের পর আবারও তাঁকে কলকাতা ছাড়ার আদেশ দেওয়া হয়। এবার তিনি প্রকাশ্যে কলকাতা ত্যাগ করে চলে যান।

১৯৪০ সালের ২৩ জুন গোপনে কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর ১৯৪২ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত গোপনে পার্টির কাজ চালিয়ে যান। ১৯৪২ সালে সুনীল বসুর (কাটু) সঙ্গে নিয়ে ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’কে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার কাজে তাঁর নাম অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

১৯৪৫ সালে ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণায় নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনদিনব্যাপী এ সম্মেলনে মুজফফর আহমদ সভাপতিত্ব করেন। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলা ও হিন্দিতে দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ এবং সাপ্তাহিক ‘মতামত’ প্রকাশ করেন

১৯৪৮ সালে কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেস ছাড়া (কারণ দেশভাগের পর তথাকথিত পূর্ব-পাকিস্থানের নেতারা তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে) প্রত্যেকটি পার্টি কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন।

দেশ বিভাগের পূর্বে বঙ্গীয় পার্টির সম্পাদক ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এই সম্মেলনে ভারত ও পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি আলাদা আলাদা ভাবে কাজ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে ভারত সরকার কমরেড মুজফফর আহমদকে গ্রেপ্তার করে।

১৯৫১ সালের ২৭ এপ্রিল মুক্তি পান। এই বছর তিনি রাজ্য কমিটির সম্পাদক হন। এরপর ১৯৫২ সালে গোপন ছাপাখানার কর্মী কালী চৌধুরী ও সমীর দাশগুপ্তকে নিয়ে ‘গণশক্তি’ প্রিন্টার্স “প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫৩ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে পার্টির সম্পাদক পদ ছেড়ে দেন। কমরেড জ্যোতি বসু সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কমরেড মুজফ্ফর আহমদের নেতৃত্বাধীন পার্টির প্রকৃত বিপ্লবী অংশ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) নামে পরিচিত হয়।

কমরেড মুজফফর আহমদ এই সময়েও মস্কো ও পিকিং-এর অন্ধ অনুসরণের বিরোধিতা করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কমরেড মুজফফর পূর্ণ সমর্থন দেন। ঐ দিনগুলোতে পার্টি মুখপত্র ‘গণশক্তি’র দৈনন্দিন সংবাদ সমালোচনা ও সম্পাদকীয়তে তার স্বাক্ষর মেলে। মুজফফর আহমদের ভাষায়, “পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচার হতে মুক্ত হবার জন্য বাংলাদেশের মানুষেরা যেভাবে সংগ্রাম চালিয়েছেন, তার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে কম। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি একজন অক্ষম অসমর্থ বৃদ্ধ, যদি আমার শরীরে শক্তি থাকত, তা হলে আমিও বাংলাদেশের মুক্তি ফৌজে যোগ দিতাম”। কর্মীদেরকে শরনার্থী শিবিরে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন।বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে সব সময় গর্ব করতেন।

মুজফফর আহমদের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে পার্টি অফিসে, কারাগারে কিংবা গোপন আস্তানায়। এ ছাড়া পার্টি কর্তৃক ভাড়া করা ঘরে অথবা কর্মস্থলে। নিজের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে কিছু করেননি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে পার্টি কর্তৃক নিয়োজিত একজন কর্মী তাঁর দেখাশুনা করতেন। মৃত্যুর আগে প্রায় সাত মাস তিনি কলকাতায় একটি নার্সিং হোমে ভর্তি ছিলেন।

১৯৭৩ সালে ঢাকা সফরে আসেন। এবং এবছরের ১৮ ডিসেম্বর কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আপসহীন এই মানুষটি কলকাতায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কলকাতার গোবরা ৩নং কবরস্থানে কমরেড কমরেড মুজফফর আহমদ শায়িত আছেন।

কমরেড মুজফ্ফর আহমদের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি”। দৈনিক গণশক্তি ভবনে রয়েছে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ পাঠাগার।

তথ্যসুত্রঃ অনলাইন।

Facebook Comments
এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!