1. admin@chunarughat24.com : admin :
ব্রিটিশদের লুটের রাজত্বঃ একটি চিরস্থায়ী ভাবনা - চুনারুঘাট
সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

ব্রিটিশদের লুটের রাজত্বঃ একটি চিরস্থায়ী ভাবনা

আরণ্যক আচার্য
  • সময় : বুধবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২১
  • ২৯ বার পঠিত
ব্রিটিশদের লুটের রাজত্বঃ একটি চিরস্থায়ী ভাবনা

আরণ্যক আচার্য।। ১২০-১৫০ বছর ধরে ব্রিটিশরা নানাবিধ অত্যাচার, সেনা নামিয়ে জোর করে খাটানো, দাসত্বসহ নানান উপায়ে যে অর্থ ভারত থেকে লুট করে নিয়ে গিয়েছে তার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশই খাজনাসূত্রে প্রাপ্ত। ১৮০০ অথবা ১৮৫৭-৫৮ তেই ব্রিটিশরাই অনুভব করছিলো বন্দুকের বোয়োনেটের খোঁচায় ভারতের কর আদায় হতো।

তখন কোনো কোনো এলাকায় করের হার সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। যে কর তারা আদায় করে তার অধিকাংশই ব্যয় হতো এক শতাব্দ জুড়ে সেন্ট হেলেনা থেকে হংকং পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার এবং রক্ষার কাজে। একই সঙ্গে কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজ এবং দিল্লির মতো শহর তৈরি, অজস্র সেনা ছাউনি তৈরি, ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের অস্থায়ীভাবে থাকার জন্য ১৮০০র অনেক আগেই তৈরি হয় প্রচুর বাংলো, তৈরি হয় প্রচুর পার্ক, ক্লাব, এবং স্থায়ী বাসস্থান, ব্রিটিশ ভারত এবং রাজন্যশাসিত ভারতেও।

১৮৫৮-এ জন স্টুয়ার্ট মিলের অনুসরনে বলতে পারি, আফ্রিকার পশ্চিমতটের দ্বীপ সেন্ট হেলেনা থেকে চীনা সমুদ্রের দ্বীপ হংকংএর দখল এবং তার প্রশাসন চালানোর জন্য এক পেনিও বরাদ্দ হয় নি। সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ হয়েছিলো প্রথমে বাংলা পরে সমগ্র ভারত থেকে।

ঊনবিংশ শতকে ভারতের ব্রিটিশ ভাইসরয়ের কাছে এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদকে পাঠানো হয়েছিল জানতে যে ব্রিটিশ শাসন পূর্ব সময়ে খরা অথবা মন্বন্তরের সময় শাসকেরা কী করতেন। তিনি অর্থনীতিবিদকে খানিকটা তাচ্ছিল্যভরে জানান, সে যুগে উৎপাদন না হলে রাজারা কর আদায় করতেন না। কিন্তু আজ আমরা একই নীতি অনুসরণ করতে পারি না। আমাদের খরচ ধরা রয়েছে, সেগুলো যে কোনও উপায়েই তুলতে হবে। তাই উৎপাদন হোক আর না হোক আমাদের কর আদায় করতেই হবে। তবে আমরা আমাদের কর আদায়ের মাত্রাকে যথাকিঞ্চিত কমাতে পারি মাত্র।

ব্রিটিশ পূর্ব সময়ে ভারতেবর্ষে কর আদায়ের এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা ছিলো না। বিশেষ করে উপকূল এলাকায় কোনো কর ছিলো না। রাষ্ট্রের রোজগার হতো ব্যবসা বাণিজ্য থেকেই। বাকি অংশ, যথাসম্ভব ভারতের তিন-চতুর্থাংশ কৃষি জমির একের পঞ্চমাংশ থেকে অর্ধাংশ ব্যয়িত হত সৈন্য, আরক্ষা বাহিনী, এবং প্রশাসনিক কাজে।

গ্রামের পরিকাঠামো যেমন সেচ ব্যবস্থা, খাল কাটা, নালা কাটায় ব্যয়িত হত ৪ শতাংশ কৃষি উৎপাদন। অধিকাংশ কর বরাদ্দ হতো এই এলাকার সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং শিক্ষাকেন্দ্রের বিকাশের জন্য। বহুদূরের অনেক কেন্দ্রই এই বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হতো না। মোটামুটি মনেহয়, সুদূর অতীত থেকেই সরকার, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবেই এক- তৃতীয়াংশ কৃষিজমি বিভিন্ন সংগঠন (ইন্সটিটিউশন) এবং ব্যক্তিকে চিরকালের জন্য দেওয়া থাকতো। আরও একতৃতীয়াংশ কৃষিজমির মোট উৎপাদন বরাদ্দ থাকতো বিভিন্ন পরিকাঠামোর বিকাশের জন্য – ৫০ থেকে ১০০ সংঘ অথবা ব্যক্তির মধ্যে।

১৭৭০-এ বাঙলার শুধুমাত্র একটি জেলায় এ ধরনের ৬০,০০০ জমি বরাদ্দ ছিলো, এমন দাবি করা হয়েছে। এমনকী ১২০০ থেকে ১৭৫০ এর বাঙলায় ইসলামিক শাসনের সময়ও হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের সংঘ ও ব্যক্তির মধ্যে এ ধরণের দান প্রাপ্তির তুলনা ১০এর ১ অর্থাৎ একজন মুসলমানের তুলনায় এ ধরনের জমি বা উৎপাদন ভোগ করত ১০ জন অমুসলমান।

১৭৭০এর বাংলা এবং ১৮০০র দক্ষিণ ভারতের হিসেব রক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ শাসনের সময়ের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশ কর আদায় হতো। এটি অথবা অন্যান্য সূত্র থেকেও জানা যাচ্ছে, ১৮০০ পর্যন্ত অব্রিটিশ এলাকায় মোট কৃষি জমির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উৎপাদন কর হিসেবে বরাদ্দ হতো।

ব্রিটিশ শাসিত এলাকায় জমির কর নির্ধারিত হলো ৫০ শতাংশের আশেপাশে। কৃষকের কৃষি উৎপাদনের গড় দাম নির্ধারণ করে, সেই পরিমানকে অর্থে পরিণত করে কর আদায় করতো। এর সঙ্গে জুড়ে দিতো নানান অতিরিক্ত শুল্ক যা পূর্বে ব্যবহৃত হতো বিভিন্ন গ্রাম বিকাশের কাজে। মোট ৬০ শতাংশের কাছাকাছি।

১৭৮০ পর্যন্ত এই প্রবণতা বাংলা বিহারে ব্রিটিশ প্রশাসনের গবেষণাগারে চর্চিত হয়, পরীক্ষা হয়। ১৮৬০সালের পর পর্যন্ত কৃষকেরা তাদের মোট কৃষি উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে বাধ্য হয়েছে। কোনও এলাকায় কৃষি কর জমির মোট উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে যায়, জমির মোট ফসল কর রূপে দিয়েও কর শোধ হতো না।

১৮৪০এর আশেপাশে মাদ্রাজ প্রদেশের সব থেকে উর্বর জমির এক তৃতীয়াংশে কৃষক চাষ করা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, ব্রিটিশ নথিতে যাকে বলা হয়েছে বিপুল রাজস্ব ঘাটতি।

ব্রিটিশদের কাছে উচ্চ কর-হার কোনো নতুন ঘটনা নয়। ১৭৫০এ ব্রিটেনসহ বিভিন্ন ইউরোপিয় দেশে কৃষি উৎপাদনের কর হার ছিলো ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ।

১৮০০তে ব্রিটিশ খেতমজুর অথবা কৃষি শ্রমিকেরা অথবা অস্থায়ী কৃষকেরা, যারা আদতে জমিতে হাত লাগিয়ে কৃষি উৎপাদন করতো, তারা পেতো মোট উৎপাদনের ১৮ শতাংশ মাত্র। ভারতের কৃষকদের দুর্দশা ব্রিটিশদের গা সওয়া ছিলো, কেননা তাদের নিজেদের দেশেই শতাব্দের পর শতাব্দ জুড়ে কৃষকদের একই হাল করে ছেড়ে ছিলো। ভারতে এমন বহু তলুকের সৃষ্টি হলো, যেখনে জনসংখ্যা অর্ধেকেরও কম সংখ্যায় নেমে এলো। যেমন অন্ধ্র প্রদেশের পালনাদ তালুক, অথবা ১৭৭০এর বাংলা-বিহার, শেষ পর্যন্ত যা সাধারণ মানুষের শিরদাঁড়া ভেঙে ফেলার কাজ করে। ইউরোপেও ১৯২০ পর্যন্ত সাধারণের সঙ্গে একই অত্যাচার করা হয়েছে।

এর সঙ্গে আরও কিছু তথ্য যদি আমরা এক সঙ্গে যোগ করি তাহলে বোধহয় ব্যত্যয় হবে না।

১৭৫০ পর্যন্ত আজকে যে অঞ্চলকে তৃতীয় দুনিয়া আখ্যা দেওয়া হয়, সেই ভারত চীন যৌথভাবে বিশ্বের শিল্প উৎপাদনের ৭৩ শতাংশ সরবরাহ করতো।

১৮৩০-এও ছিলো ৬০শতাংশ। যারা ভারতের জনসংখ্যা বিষয়ে মাথা ঘামান তাদের জন্য বলা যাক, ১৯০০-এর আদমশুমারিতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা অনেক কাছাকাছি ছিলো। একশ দশ বছর পর আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছি।

১৯০১-এর আদম শুমারিতে প্রতি ১০০০ পুরুষের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা ছিলো ৯৮০।

১৯৯১এর জনগণনায় মহিলাদের সংখ্যা ৯২০-এ এসে ঠেকেছে। এই ঘটনা ঘটেছে এমন সময়, যে সময়কে বলা হয় ভারতীয় মহিলাদের জাগরণের যুগ।

আরও অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। ১৮৮১-১৯১১-এর তথ্য অনুযায়ী ৫ জনের একজন মহিলা (৩ মাস থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত ধরে) বিধবা। এই পুরুষদের কী ঘটলো।

আদতে ১৭৪৮ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সাধারণ ধারণায় কয়েক লাখ স্বাধীণতা সংগ্রামী শহীদ হন নি, অথবা কয়েক কোটি মানুষ মন্বন্তরে খুন হন নি, আদতে ভারতজুড়ে ব্রিটিশ শাসন নীতিতে মারা গিয়েছেন ২৫ থেকে ৫০ কোটি ভারতীয়।

বিশ্বের যে অঞ্চলেই ইউরোপিয় দখলদারেরা গিয়েছে, সেই অঞ্চলেই এ ধরণের মৃত্যু উপত্যকা সৃষ্টি করেছে। তারা যে শুধু এ ইউরোপিয় দেশগুলোতে এই কান্ড ঘটিয়েছে এমন নয়, এই ঘটনা ঘটেছে বহু শতাব্দ জুড়ে আয়ারল্যান্ডে।

মনে রাখা দরকার ইউরোপিয়দের সব থেকে বড় চরিত্রগুণ হলো তারা আদতে খুনি। ভারতের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি।

লেখকঃ লোকফোকার।

Facebook Comments
এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!