1. admin@chunarughat24.com : admin :
শব্দ দূষণঃ আরেক অদৃশ্য মহামারী
বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ০২:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ইসরায়েলের পার্লামেন্টারি কমিটির নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয় বিশ্বের সোয়া ১৪ কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেল কিউবায় নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হলেন ফোর্বস ম্যাগাজিনে জায়গা পেলো বাংলাদেশী ৯ তরুণ ‘চিকিৎসক ও পুলিশের পাল্টাপাল্টি বিবৃতি কাম্য নয়’ ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কাটার তাগিদ দিয়েছে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন সারাদেশের অধঃস্তন আদালতে ১০৬৮১ আসামীর জামিন চিকিৎসকের শব্দ অরুচিকর, ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানালো পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশন চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় মামলা, তদন্ত কমিটি গঠন ‘কঠোর লকডাউন’ আরো এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

শব্দ দূষণঃ আরেক অদৃশ্য মহামারী

চুনারুঘাট
  • সময় : রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১
  • ১৭৮ বার পঠিত
শব্দ দূষণঃ আরেক অদৃশ্য মহামারী

শব্দ দূষণ বলতে মানুষ বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী কোনো শব্দ সৃষ্টি হওয়ার কারণে শ্রবণশক্তি কিংবা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। মানুষ সাধারণত ২০ হার্জের কম এবং ২০,০০০ হার্জের বেশী মাত্রার কোনো শব্দ শুনতে পায় না। মানুষের কান যেকোনো শব্দের বিপরীতে সংবেদনশীল। তাই শব্দ দূষণ এই সীমার তীব্রতার তারতম্যের মধ্যেই হয়ে থাকে।

শব্দ দূষণও আরেকটা ঘাতক, পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর যার রয়েছে অদৃশ্য অথচ সবচেয়ে বেশী মারাত্মক প্রভাব।

এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার বর্ণনায় একজন চিকিৎসক বলেন, শব্দ দূষণ প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির অসুস্থতাকে তো করেই, এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে।

তিনি জানান, লম্বা সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে বসবাস করায় হাইপার টেনশন, আলসার, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, উগ্রতা, অটিজম, হৃদরোগ, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, স্নায়ুর সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অবশ্য চাইলে যাচাই করে নেয়া যায়- আমরা শুনছি প্রচুর, কিন্তু মনে রাখতে পারছি অনেক কম বা পারছি না।

এসব রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিসেবে চিকিৎসকের পরামর্শ হচ্ছে- শব্দ দূষণ রোধ করা। এ ছাড়াও তাঁর মতে, শব্দের ধরণ ও মাত্রা থেকেই বুঝা যাবে জাতি কতোটা সুস্থ, সভ্য, এবং পরিবেশ কতোটা উন্নত।

দূষণ রোধকল্পে বাংলাদেশের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে, কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে, কি ধরনের শব্দ উৎপাদন করা পরিবেশসম্মত কিংবা দণ্ডনীয় অপরাধ। যদিও অজ্ঞ-বিজ্ঞ নির্বিশেষে বেশিরভাগ মানুষ বিধিমালার অস্তিত্ব সম্পর্কেই জ্ঞাত নন।

বরং এখানে শব্দ দূষণে বাধা দেওয়াকে অপরাধ বলে গণ্য করা হতে পারে। কারণ, পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োগের বেলায় নেই কার্যকর পদক্ষেপ। কিংবা শব্দ দূষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রচার-কর্মসূচি গ্রহণ করতেও দেখা যায়নি।

আরো পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, শব্দ দূষণকে আমরা সমস্যা বলেই মনে করি না, অপরাধ তো নয়-ই। ফলে, আমাদের শব্দ দূষণের উৎসগুলো নির্বিঘ্নে বেড়েই চলছে।

আমাদের সম্মিলিত গাড়ির হর্ন, গাড়ির বিকট শব্দ, মাইকের ব্যবহার, নির্মাণ কাজ, কাঠের কারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক শপ, কোলাহল ইত্যাদির থেকে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা বেড়েই চলছে। এমনকি সারারাত ধরেও চলে আমাদের কারখানার কাজ কিংবা ঘরবাড়ির নির্মাণ কাজ।

অথচ নিয়মমতো, আবাসিক এলাকায় রাত নয়টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা হবে ৪৫ ডেসিবল, এবং দিনের অন্যান্য সময়ে ৫৫ ডেসিবলের বেশী হতে পারবে না। আর বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবল।

আরো লক্ষণীয় যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিস-আদালতের আশেপাশের ১০০ মিটার জায়গাকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে। সেখানে দিনের বেলা সর্বোচ্চ ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া রয়েছে।

শান্তিপূর্ণ নাগরিক জীবনযাপনের স্বার্থে শব্দ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় আছে, যেকোনো এলাকায় সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ বা কোনো ধরনের মেশিন চালানো যাবে না। আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙ্গার মেশিনের মতো শব্দসৃষ্টিকারী মেশিন ব্যবহার করা যাবে না।

উল্লেখ করা যায়, আমরা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবল শব্দে কথা বলি। আর মানুষের কানের সহ্য ক্ষমতা ৭০ ডেসিবল পর্যন্ত। তবে ৮০ ডেসিবলের উপরে গেলে ক্ষতি শুরু, অর্থাৎ দূষণ সরাসরি আমাদের শরীর ও মনের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে থাকে।

দেশের জেলা-উপজেলা সদর, শহর বা পৌরএলাকাকে নমুনা হিসেবে নিলে প্রায়ই দেখা যায়, দিন নেই রাত নেই চলছে মোটর গ্যারেজের কাজ, কাঠের কারখানার কাজ, ইট ভাঙ্গার কাজ, ছাপাখানা, মালামাল লোড-আনলোড, সাজসজ্জার কাজ। পাশাপাশি ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানাদি তো লেগেই থাকে।

রাজপথে হর্ন বাজানো আমাদের চালকদের একটি জনপ্রিয় অভ্যাস। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালু হওয়ার পর হর্নের মাত্রা শতগুণ বেড়ে গেছে। জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনগুলোর হর্ন শুনলে মনে হবে হর্ন বাজিয়েই জ্যাম ছাড়িয়ে নিতে চায়। ফাঁকা রাস্তায় অনেকটা শখ করেই হর্ন বাজায় অটো রিকশাগুলো।

বেশিরভাগ শহরের রাস্তার দুই পাশে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বসবাস গড়ে উঠায় এসব এলাকার বাসিন্দারা দিনরাত একই রকম শব্দ দূষণের শিকার হয়ে থাকেন। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন এখানে সম্পূর্ণ অকার্যকর, করলে হয়তো বাজারব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। অন্যদিকে, শব্দ দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগও নেয়া হয় না।

সংবিধিবদ্ধ নিয়মনীতি থাকলেও সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে কোনো অভিযোগ করা যাচ্ছে না, কর্তৃপক্ষও উদাসীন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, যেখানে শব্দ উৎপাদন লাভজনক সেখানে আমাদের বাধা প্রদানকে ভালো চোখে দেখবেন না উৎপাদনকারীরা। অবশ্য এসব বিষয় দায়িত্বশীল প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আশেপাশে, চোখের সামনে ঘটছে। তারা নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, নাগরিক পরিবেশ রক্ষায় তারা অঙ্গীকারাবদ্ধও।

অনেকে অভিযোগ করেন, আশেপাশে কোনো বয়স্ক ও অসুস্থ কেউ আছে কি না, কারো সন্তানের পড়াশুনায় ক্ষতি হচ্ছে কিনা, কারো ঘুমের ব্যঘাত ঘটছে কি না, কারো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যঘাত ঘটছে কি না, এসব নিয়ে কেউ ভাবেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুরোধ করে ফল পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষেরা শব্দ উৎপাদন করাকে তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে বলেও জানিয়ে দেন। অথচ আবদ্ধ কোনো স্থানেও শব্দযন্ত্র ব্যবহার করলে শব্দ যাতে বাইরে না যায় তা নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে।

এমনকি শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধি অনুযায়ী, রাজনৈতিক সভা, খেলাধুলা, কনসার্ট, বিয়ের অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, যাত্রা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে শব্দযন্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে, অনুষ্ঠান ৫ ঘণ্টার বেশী হবে না, এবং অবশ্যই রাত ১০টার মধ্যে শেষ করতে হবে।

এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শব্দ দূষণ আমাদের সার্বিক সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলেই এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু, স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে না পারলে, বা ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে না ধরলে, আইন দিয়ে কোনো দূষণই রোধ করা যাবে না।

শব্দ দূষণের জন্য নিম্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা পর্যন্ত দায়ী। এছাড়া নিজের কার্যোদ্ধারের বেলায় আমরা অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ি বিধায় অন্যের সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে পারি না। অন্যদিকে, সমস্যাগ্রস্ত একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব বন্ধ করা সম্ভব না।

শব্দ দূষণ বন্ধে মানুষের প্রতিক্রিয়া ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে এক জরিপে দেখা যায়, কোথাও শব্দ দূষণ হলে ৫৯ জন কেবলমাত্র বন্ধ করার অনুরোধ জানান, ১৮ জন পুলিশে এবং ১৪ জন কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ জানান। আর ৫ জন ঝগড়া বাধিয়ে দেন, এবং ৪ জন কিছুই করেন না।

একজন পরিবেশকর্মীর মতে, অন্যের সমস্যা- সম্ভাবনার প্রতি আমাদের সম্মান প্রদর্শনের মারাত্মক অভাব রয়েছে। অনুভূতিহীনতার ফলে, ছোট সমস্যাও দিনদিন বড় হয়ে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সুশীল নাগরিক ও প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীলতার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। কিন্তু মানুষ চাইলেই সবকিছু পরিবর্তন করতে পারে, সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে।

যেকোনো সামাজিক সমস্যা নিরসনে জনসচেতনতার বিকল্প নাই। শব্দ দূষণ জাতির মেধা-বুদ্ধি ও সুস্থতার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

এ জন্য সরকারী প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি।

Facebook Comments
এ জাতীয় আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!