1. admin@chunarughat24.com : admin :
'দুঃসময় থেকে সুসময়, মানুষই পৌঁছে দেবে মানুষকে'
বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

‘দুঃসময় থেকে সুসময়, মানুষই পৌঁছে দেবে মানুষকে’

মমতা নূর
  • সময় : শনিবার, ২৯ মে, ২০২১
  • ২০৮ বার পঠিত
'দুঃসময় থেকে সুসময়, মানুষই পৌঁছে দেবে মানুষকে'

শব্দ। শব্দ থেকে বাক্য। বাক্য থেকে বাক্যবাণ। বাক্যবাণের নিরব অস্ত্র নিউরনে নিউরনে ক্ষতের সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদি হয়। শুকাতে সময় লাগে কিংবা কখনো কখনো তা শুকায় না।

পচন ধরায় বিবেকে, পচন ধরায় মানসিকতায়। ধ্বংস হয় মানবতা। মনুষ্যত্ব ভুলে মানুষ হয়ে ওঠে শুধুই পুরুষ কিংবা শুধুই নারী।

সংসারে পাশাপাশি অবস্থান করেও কোথাও যেন থেকে যায় চির শত্রুতা! পুরুষ ভাবে ‘সুবিধা দিচ্ছি’, নারী ভাবে ‘পুরুষের মত পাচ্ছি না’। হয় সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, টক-শো।

সেখানেও একে অপরের বিপরীতে ছোঁড়ে বাক্যবাণ। রক্তাক্ত করে, নিজে রক্তাক্ত হয়। তবুও নির্বোধ চেতনা বুঝতে দেয় না রক্তক্ষরণ। ক্ষেপিয়ে রাখে। এতটাই শক্তিশালী শব্দশাস্ত্রে তৈরি বাক্যের তীর।

অথচ কথায় বলে, একটি সুন্দর উক্তি রত্নের চেয়েও মূল্যবান। একটি চমৎকার অনুপ্রেরণামূলক উক্তি দূর্বলকে যোগায় শক্তি, দিশেহারাকে দেখায় পথ, অন্ধকারে জ্বালায় আলোর মশাল।

ভাষা মানুষের মনন মগজের বিগলিত রূপ। মুখের ভাষা এমন একটি বিষয় যা মুহূর্তে মানুষকে আপন কিংবা পর করে দেয়।

নেলসন মেন্ডেলা বলেন “যদি তুমি কোনো মানুষের সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলো যা সে বোঝে, তবে তা তার মাথায় যায়। যদি তুমি তার সঙ্গে তার নিজের ভাষায় কথা বলো তবে তা তার হৃদয়ে যায়।”

ভাষা হচ্ছে সমাজের রোডম্যাপ। যা সমাজের মানুষের ভাবনাকে ধারণ করে।

ভাষা দ্বারা খুব সহজে বোঝা যায় কোনো সমাজের মানুষ কোথা থেকে এসেছে এবং কোনদিকে যাচ্ছে।

ফলে কোনো সমাজের নারী কিংবা পুরুষের অবস্থানও সেই সমাজে ব্যবহার হওয়া ভাষার মাধ্যমে বোঝা যায়। অনেক সময় ভাষার মাধ্যমে লিঙ্গীয় বৈষম্যের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়।

কা-মহিলা যেমন শুনা যায় না, তেমনি বেশ্যার পুরুষবাচক শব্দও অভিধানে নেই। নেই কথ্য কিংবা আন্ঞ্চলিক ভাষায়।

নিত্য পুরুষবাচক ‘কাপুরুষ’ এর মত দু একটি শব্দ পাওয়া গেলেও অভাব নেই নারী শব্দবাণের। এক বেশ্যা শব্দেরই আছে বিভিন্ন রূপ।

স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বেশ্যা কখনো কখনো মাগী, খানকি, নটীতে রূপ বদলায়। ভদ্রসমাজ ইদানিং বলছে নিশি কন্যা।

রয়েছে মুখরা, ছিনাল, কুটনি, পোড়ামুখী, সতী/অসতীর মত শব্দের অস্ত্র।

সন্তান ধারণে অক্ষম নারীকে যেমন বন্ধ্যা হতে হয়, পুরুষকেও শুনতে হয় নপুংসকের মত বাক্যবাণ।

আবার দেখতে আকর্ষণীয় মেয়েরাও বাদ পড়ে না। মা নামের পবিত্র শব্দের সাথে ল জুড়ে দিয়ে মাল বানিয়ে নেয় নিচুতার সুনিপুনতায়।

এই নিচুতা তৈরি হয় বিবেক মরে গেলে। তা সে পুরুষ অথবা নারী। আগে নারীদের অবজ্ঞা করতো শুধুই পুরুষ।

অবজ্ঞা সয়ে সয়ে সংসারে কখন যে পুরুষের মত হয়ে উঠতেন জ্যেষ্ঠ নারীরা, তা তারা নিজেরাও জানতেন না।

পুরুষের পাশাপাশি সেই জ্যেষ্ঠ নারীরাও ব্যবহার করতেন বেশ্যাখোর, মাগীবাজ, খানকির ইত্যাদির মত বাক্যবাণ।

সমাজ সভ্য হচ্ছে। তথাকথিত সভ্য সমাজে বাড়ছে ইভটিজিং। মাল শব্দটির ব্যবহার বাড়ছে। তবে মেয়েদের টিজার এখন শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও।

বন্ধুকে সন্তুষ্ট করতে চমৎকারভাবে মাল শব্দবাণ মুখের ধনুকে টেনে ছুঁড়ে দিচ্ছে অন্য একটি নারীর দিকে।

আবার অনেক মেয়েরা শুরু করেছে ‘এডামটিজিং’। নারীবাচক মাল শব্দবাণ পুুরুষের দিকেও ছুঁড়ছে তারা।

মাল এখন তাই উভয় লিঙ্গীয় শব্দবাণ। এভাবেই ভোঁতা হচ্ছে চেতনা।

এ্যাকশন এইড বলছে “বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক কথা, গালি, তিরষ্কারমূলক শব্দ সাধারণত নারীকে অবমাননা অথবা হয়রানি করার জন্য ব্যবহার হয়।”

শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরনের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয় তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন – ভাষার মাধ্যমে নারীকে হেয় করা বা হয়রানি করার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে।

এর ফলে নারীর আত্মবিশ্বাস কমে যায। নারী সমাজে তার অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত থাকে। সামাজিক বিভিন্ন কাজে নারীর অংশগ্রহণও কমে যায়।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আর একটু শঙ্কার। তৃতীয় বিশ্বের পৌণে একশো বছরে এই শঙ্কা আরো গাঢ় হচ্ছে।

কারণ একটাই- মানুষ হয়ে ওঠার গল্পটি আমাদের শেখায়নি সমাজ।

শিখিয়েছে পুরুষ হতে। শিখিয়েছে সুনিপুণভাবে নারী হয়ে গড়ে উঠতে।

লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার একটি বড় কারণ ছেলেদের সমাজে শেখানো হয় ছেলেরা কাঁদবে না। অর্থাৎ তারা আবেগ প্রকাশ করতে শেখে না।

যে কারণে তারা সহিংস একটি প্রকাশের মাধ্যমে তাদের আবেগ প্রদর্শন করে।

অনেক শব্দের মাধ্যমে নারী যে আহত বা অসম্মানিত হতে পারে, সে ব্যাপারে ধারণাও থাকে না অনেক পুরুষের।

এতে নারীর কাছে পুরুষের অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে ওঠে। সহযোগী না ভেবে, প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শেখে।

মানুষের মুখের ভাষা যখন অসহায় হয়ে যায়, তখন চোখের জল কথা বলে। চোখের জল সম্বল করে কোন সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

কেবল ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন হবার মাধ্যমে যে সমাজে নারী পুরুষের বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা যেতে পারে এটা ছড়িয়ে পড়া জরুরি।

ছড়িয়ে পড়া জরুরি নারী কিংবা পুরুষ নয় বরং সমাজ বদলে নারী পুরুষের পারস্পরিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

সুদিন সুনিশ্চিত তখনই যখন আমরা ভাষাকে শব্দাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার না করে মানবতার জয়গান প্রচারের সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করবো।

যখন নারী কিংবা পুরুষের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার গল্পে সামিল হবো।

তুরস্কের নাজিম হিকমত, যার জীবনের বেশীরভাগই কাটে জেলখানার ভেতর। সাম্য ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। মানুষের গল্প বলেছেন।

মানুষের অধিকারের কথা বলার অপরাধে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিলো।

সাম্য ও বিপ্লবের ফিনিক্স নাজিম হিকমতের চিরপ্রত্যাশা- দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষই পৌঁছে দেবে মানুষকে।

লেখক: মমতা নূর

কবি ও সমাজকর্মী।

Facebook Comments
এ জাতীয় আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020-2021 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!