1. admin@chunarughat24.com : admin :
শৈশবের ফেরেশতাগণ আর শেষ জামানার হুজুরের ৬ টুকরো লাশের গল্প
বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন

শৈশবের ফেরেশতাগণ আর শেষ জামানার হুজুরের ৬ টুকরো লাশের গল্প

সাইফুল জার্নাল।
  • সময় : রবিবার, ৩০ মে, ২০২১
  • ১৩৩ বার পঠিত
শৈশবের ফেরেশতাগণ আর শেষ জামানার হুজুরের ৬ টুকরো লাশের গল্প
photo: pixabay

শৈশবে ভোর বেলা উঠে মাথায় টুপি দিয়ে, সিপারা হাতে নিয়ে, নামাজের পাটি বগলে করে ভাইদের সাথে মক্তবে পড়তে যেতাম।

মক্তবে গিয়ে যার যার পাটি বিছিয়ে নিতাম। কেউ পড়তো আর বেশির ভাগই গল্প আর দুষ্টুমি করতো মানে করতাম।

এর মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে গায়ে সাদা পাজ্ঞাবি মাথায় আরবী গামছা আর পরনে লুঙ্গি, পায়ে রাবারের সু।

কাঠের ডাটির ছাতা হাতে পঞ্চার্শোধ মেছাব (হুজুর) ঢুকতেন মক্তবে (টিএন্ডটি র পরিত্যাক্ত ভবন)।

আমরা আকারে ছোট ও বসে থাকার কারণে উনাকে বেশ লম্বা লাগতো।

শ্রদ্ধা আর ভয়ে তাকেঁ দেখে সবাই সালাম দিতাম আর যে যার কিতাব নিয়ে তার স্বরে চিৎকার করতে থাকতাম।

সবার সাথে মাথা ঝাকিঁয়ে আমিও সুর মিলিয়ে শব্দ করতাম।

মেছাব একে একে সবার পড়া ধরতেন, ঠিকঠাক ভাবে না পাড়লে বাঁশের কঞ্চির বাড়ি সু নিশ্চিত। তার জন্য আমি একটু ভয়ে থাকতাম।

একটা সময় পর্যন্ত হুুজুর আমার পড়া ধরতেন না -(তখনো আমি দুধভাত!)।

দুষ্টুমি করলে কিছু বলতেন না বরং আদরটাই করতেন পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও চেনা জানার কারণে।

মক্তবে আসতে যেতে ভালই লাগছিলো।

একদিন হুজুর একটি ছেলেকে মেরে দুটো বাশেঁর কঞ্চি ভাঙ্গলেন। ভয়ে পরের দিন থেকে আমি মক্তবে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

মাস শেষে হুজুর আমাদের বাসায় আসতেন মক্তবের বেতন নিতে।

আম্মা উনাকে চা নাস্তা দিতেন, মাসলা মাসায়েল নিয়ে নানান প্রশ্ন করতেন, মেছাব তার জানার মধ্যে যথাসাধ্য উত্তর দিতেন।

আম্মা নানা বাড়ির খোঁজ খবর নিতেন। সব শেষে মেছাব পানের বাটা থেকে পান নিয়ে বিদায় নিতে থাকতেন।

আম্মা তখন রোল করা কিছু টাকা মেছাবের হাতে দিতেন মাসের বেতনের হিসাবে।

কথা প্রসঙে আমি কেন মক্তবে যাই না, তার কারণ জিজ্ঞাসা করেন মেছাব।

আম্মা বলেন “হুরুত মক্তব যাইত ডরায়, বড় হইলে যাইবো নে” (ছোটতো মক্তব যেতে ভয় পায়,বড় হলে যাবে)।

আমার বলা শাস্তির ঘটনাটা মেছাবকে বলেন। মেছাব শাস্তি দেবার কারনটা বলেন- একটা মেয়েকে উতক্ত্য করার দায়ে তাকে শাস্তি দিয়েছেন।

স্থানীয় ভাবে প্রভাবশালী ব্যাক্তির পুত্রকে শাস্তি দেবার পর তার বাবা বলেছিলেন “পরের বার হাড় মাংস আলাদা করে বাড়িতে পাঠাবেন।”

মেছাব চলে যাবার পর আম্মা বল্লেনঃ “খারাপ কাজ করলে মেছাব শাস্তি দেন আর সেটা গিয়ে শয়তানের গায়ে লাগে।

তখন শয়তান আর কাছে আসতে সাহস পায়না, তখন মানুষ ভালো হয়ে যায়।”

এরপর থেকে মেছাবকে আর ভয় পেতামনা, নিয়মিত সহোদারদের সাথে মক্তবে যাই, অনুষ্ঠানিকভাবে সিপারা শেখা শুরু করি।

একসময় আমাদের বাসার পাশেই উপজেলা কমপ্লেক্স এ কোর্ট মসজিদ তৈরী হয়।

সেখানে এক হুজুর আসেন- গোলগাল চেহারায় সুন্দর দাড়ি, পোষাক আরো সাদা আরো সুন্দর, শরীর থেকে অদ্ভুত রজনিগন্ধা ফুলের সুবাস আসে।

নামাজের সময় সুরা পড়েন একটু ভিন্ন ভাবে একটু ভিন্ন সুরে। সুরার আয়াতের বিভিন্ন স্থানে জোর দেন কখনো বা নাকে নাকে বলেন।

সবসময় মুসুল্লিদের সাথে হাসিমুখে কথা বলেন।

দুর থেকে তাকেঁ দেখতাম। জানলাম উনি শহরের পাশের গ্রামেই বাড়ি ,পড়াশোনা করেছেন জেলা শহরের বড় মাদ্রাসায়।

উপজেলার সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীও পাশের পাড়ার শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেবার জন্য মক্তব খোলা হল নতুন মসজিদে।

নতুন হুজুরকে অনুরোধ করা হলো পড়ানোর জন্য। নতুন মসজিদ, মক্তব আর সুন্দর মিষ্টি। হুজুরের কাছে পড়তে থাকলাম।

যত্ন সহকারে পড়াতেন। ধর্মশিক্ষার ভিন্ন এক ধরণ আমাদেরও আগ্রহী করতো।

তিনি মক্তবে পড়ার পাশাপাশি ফুল বাগানে পরিচর্যা সাপ্তাহিক মসজিদ পরিচ্ছন্ন করা এসব কাজেও আমাদের উৎসাহিত করতেন।

বিনিময়ে সবার জন্য সুপার বিস্কুট (আটা চিনির বিস্কুট) দিতেন। শিশুদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করেতেন।

বড়রাও উনার সাথে সময় নিয়ে কথা বলতেন। ভাল থাকা, সুস্থ জীবন যাপন এবং হালাল আয়ের ব্যাপারে সবাইকে পরামর্শ দিতেন।

বলতেন, ধৈয্য ধারণ করা, আল্লার উপর ভরসা রাখাই মানুষের কাজ।

জিকির আসগার, তসবিহ্ তাহতীল, মানুষের ‍মুক্তি ও ধর্মের কথা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তাঁকে কথা বলতে শুনিনি।

আমরা কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করতাম আবার মসজিদেও সময় দিতাম।

তাই দেখে কেউ কেউ বলতেন “নাটইক্যা ফুলাইন মজ্জিদ কিতা করে ? ” (নাটকের ছেলেরা মসিজিদের কি করে?)।

হুজুর বলতেন, তার তো আর চুরি চামারী নেশা পানি করেনা। নাটক টাটকেরও দরকার আছে। একসময় বুঝ হলে তারা ছেড়ে দেবে।

আমাদের শৈশবের মেছাব- হুজুর- বড় হুজুর- হাফিজ্জি হুজুর (কোরআনের হাফেজ)- ছোট হুজুর।

তাঁদেরকে কখনো কুবুদ্ধি- কুশিক্ষা দিতে দেখিনি, কুচিন্তা করতে দেখিনি, শয়তান থেকে তারা দুরে থাকতেন, তারা শয়তানকে দূর করে রাখতেন।

আমাদের শৈশবের মেছাব হুজুরদের সংখ্যাটা হয়তো কমে গেছে।

আজকাল প্রায়শই ইসলামের লেবাস ধারী হুজুরূপী কিছু মানুষ দেখা যায়, যাদের মুখোশটা খসে পড়লে শয়তান বেরিয়ে আসে।

আর খবরে প্রকাশ হয়ঃ-

শিশুকে আরবি পড়ানোর সুত্রে মায়ের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক, বাবাকে খুন।

মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে ৬ টুকরো করা লাশ উদ্ধার।

ধবধবে পোষাকের, স্মিতহাস্য আর সুগন্ধির সুবাস ছড়ানো আমার শৈশবের ফেরেশতারা হয়তো লজ্জাই পান।

আমাদের হুজুর, আমাদের ফেরেস্তাদের নিকট আমরাও ক্ষমাপ্রার্থী।

২৭ মে ২০২১। ঢাকা।

Facebook Comments
এ জাতীয় আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020-2021 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!