1. admin@chunarughat24.com : admin :
চলমান ইয়েমেন যুদ্ধে বিজয়ী ও লাভবান যতো পক্ষ
বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন

চলমান ইয়েমেন যুদ্ধে বিজয়ী ও লাভবান যতো পক্ষ

রাহাত খান
  • সময় : শুক্রবার, ৪ জুন, ২০২১
  • ১৪২ বার পঠিত
চলমান ইয়েমেন যুদ্ধে বিজয়ী ও লাভবান যতো পক্ষ

বিজয়ী পক্ষ সবসময় লাভবান হবে আর পরাজিত পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা যুদ্ধ বানিজ্য ও সমর নীতিতে প্রতীয়মান হয় না।

প্রায়শই দেখা যায় একটি যুদ্ধের বিজয়ী পক্ষ যুদ্ধে বিজয়ী হতে গিয়ে তার সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে বিজয়ী হয় আর তার বিনিময়ে লাভ করে পোড়া মাটি, ধ্বংসস্তুপ আর চরম দারিদ্র্য।

তখন সে বিজয়ী পক্ষ তার বিজয় উদযাপন করে চরম হতাশা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি দিয়ে।

পক্ষান্তরে পরাজিত অংশের অনেক পক্ষ যুদ্ধ চলাকালীন তাদের কৌশলগত সমরনীতি ও যুদ্ধ বানিজ্য কর্মে দক্ষতার ফলশ্রুতিতে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নেয়।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় প্রক্সি ফাইটাররা এরা মুলত যুদ্ধ ব্যবসায়ী। পৃথিবীর ছোট বড় সব যুদ্ধেই লাভবান হয় এরাই।

আরও বিশেশভাবে যেসব ক্ষেত্র বা খাত লাভবান হতে পারে সেসব হতে পারে-

সামরিক।

সামরিকভাবে এই যুদ্ধের বিজয়ী পক্ষ হতে পারে হুতি মুভমেন্ট। যারা গত এক দশক ধরে বিদ্রোহ বিপ্লবের মধ্যে একটি অসম যুদ্ধ শুরু করে রক্ত বন্যা বইয়ে নিজেদের মধ্যে হিংসা আর ধ্বংস চালিয়ে অব্যাহত রাখে এই যুদ্ধ এবং একটা দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে অর্জন করে বহুল কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

তবে তাদের সাথে এই সামরিক বিজয় এর সমান কৃতিত্ব তাদের প্রধান সামরিক ও আধ্যাত্মিক মিত্র ইরানেরও বর্তায়।

হুতি বিপ্লবীরা হয়তো সামরিকভাবে বিজয়ী হবে, বিজয়ী হয়ে বিজিত ভুমিতে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, সরকার গঠন করবে । তার সাথে তারা লাভ করবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ধ্বংসস্তুপ আর একটি বড় অরাজক জনগোষ্ঠী।

একটা চরম হতাশা আর অনিশ্চিত গন্তব্যের যাত্রা ঠিক করে দিবে তাদের এই সামরিক বিজয় কতটা তাদের সর্বাত্মক বিজয়ে পরিনত হয়, না তাদের আজকের স্বাধীনতার যাত্রা পথ চলে গেছে নতুন কোন সাম্রাজ্যের গহব্বরে।

রাজনৈতিক।

রাজনৈতিক ভাবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিজয়ী পক্ষ হবে ইসলামি রিপাবলিক ইরান আর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার বিশাল শিয়া মুসলিম নেটওয়ার্ক।

সাম্প্রতিক সময়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ইরান।

বিশেষ করে সিরিয়া ও ইরাক সংকটে রুশ-তুর্কি-পারস্য সামরিক ও রাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পক্ষ হিসাবে তাদের চমক লাগানো আভির্ভাব তাদের নতুন ভাবে পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।

তাছাড়া পরমাণু চুক্তির অচলাবস্থার সূযোগ নিয়ে পুনরায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করন তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র নামদারী অনুগতদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য অবরোধ উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতির মহাতারকায় পরিনত হয়্রেছে।

তার উপর তাদের সমর্থক ইয়েমেনী পক্ষের সম্ভাব্য বিজয়। তাদের বিশ্ব রাজনীতির এক প্রভাবশালী মুরব্বিতে পরিনত হবার সম্ভাবনা তৈরী করে দিচ্ছে।

অনেক ইরানি নেতা ঐতিহাসিক পারস্য সাম্রাজ্যের মতো আবারও বৈশ্বিক পরাশক্তিতে পরিণত হবার স্বপ্ন দেখা ও শুরু করে দিয়েছেন।

চলমান ইয়েমেন যুদ্ধে বিজয়ী ও লাভবান যতো পক্ষ

সানা সিটি। ইয়েমেন।

বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক।

এ যুদ্ধে সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরামর্শক ও প্রশিক্ষক ও হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তাছাড়া সৌদি সামরিক পর্ষদ ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের প্রযুক্তি ও কৌশলগত নির্দেশক হিসেবে প্রভুত অবদান রেখে যাচ্ছে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

অর্থাৎ তারা এই যুদ্ধের তাত্ত্বিক ও নীতি নির্ধারনী ক্ষেত্রে মুল ভুমিকা পালন করছে। অথচ রণাঙ্গনে তাদের কোন স্বশারীরিক অংশগ্রহণ নেই।

অর্থাৎ লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই যেখানে আমি নাই।

এ যুদ্ধে যদি সৌদিপক্ষ বিজয়ী হলে তার মুল ক্রেডিট সৌদি আরবের থেকে বেশি অর্জিত হত এই মার্কিন পক্ষের অথচ সেই কৌশল গত কারণেই সৌদিদের পরাজয়ের কোন ভাগই নিতে হচ্ছে না এই যুদ্ধ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর।

আবার বানিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ভাবে এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিজয়ী পক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব পরিচিত হয়েছে সমরাস্ত্র ক্রেতা হিসাবে আর তাদের ক্রয়কৃত অস্ত্রের মুল দোকানদার ও কারিগর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তার উপর আরব আমিরাত, বাহরাইন সহ আরো কিছু আরব রাষ্ট্রে ও চালিয়েছে তাদের অস্ত্র ও পরামর্শ বানিজ্য।

তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তাদের আত্মিক মিত্র ইজরায়েল ও জমজমাট বানিজ্য করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র বাজারে।

এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের এই জমজমাট সমরাস্ত্র হাঠে ভাল অংকের পেট্রোডলার কামিয়ে নিয়েছে তাদের ন্যাটো সংশ্লিষ্ট মিত্র ব্রিটেন আর ফ্রান্সও।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মতো না হলেও এই সমরাস্ত্র বাজারে একটি বড় বানিজ্যিক অংশীদারত্ব লাভ করেছে রাশিয়া।

রাশিয়ার মুল ক্রেতা ইরান ও তার মিত্রবাহিনী। তবে রাশিয়া আবার সৌদি পক্ষে ও বিক্রি করেছে তাদের পন্য।

এছাড়া বিশ্ব বানিজ্যের বিগ শট চাইনিজরাও এ যুদ্ধ থেকে তাদের ভাগের মুনাফা তুলে নিয়েছে।

সামাজিক।

সামাজিক ভাবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে লাভবান পক্ষ হল মধ্যপ্রাচ্যের একলা মানিকখ্যাত ইজরায়েল।

তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ইজরায়েল ছিল মুলত একঘরে। মিশর, তুরস্কের সাথে আনুষ্ঠানিক কুটনৈতিক সম্পর্ক থামলেও ছিল না সামাজিক মিলামিশা।

মিশর তুরস্ক ও তাদের কোন সামাজিক ও রাষ্টীয় কোন পর্যায়ে ইজরায়েলের সাথে প্রকাশ্য সম্পর্ক বা যোগাযোগ এড়িয়ে যেতো।

কিন্তু এই ইয়েমেন সংকট ইজরায়েলের জন্য খুলে দেয় মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিকতার বন্ধ দোয়ার। এখন অনেক মুসলিম রাষ্ট্র ইজরায়েলের সাথে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মুখিয়ে আছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন তো আনুষ্ঠানিক কুটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরও আরবপতিরা ও তাদের পূর্ব পুরুষ ইব্রাহিমের বংশধর ইজরায়েল ভাইদের (আব্রাহামিক ট্রট) সাথে ভাতৃত্ব মুলক সম্পর্ক স্থাপনে উদগ্রীব।

এশিয়ার তথা বিশ্বের অন্যতম বড় বানিজ্যিক হাট দুবাই আবুধাবি আজ ইহুদি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর শুল্কমুক্ত বানিজ্য সেবার উম্মুক্ত বিচরনক্ষেত্র।

আর মুসলিম বিশ্বের প্রতীক সৌদি আরব সরাসরি ঘোষণা না দিলেও অনানুষ্ঠানিক ভাবে ঈসরায়েলের সাথে কুটনৈতিক, বানিজ্যিক ও কৌশলগত সমঝোতামুলক সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছে।

ইজরায়েল এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের একলা মানিক নয়। সে এখন ভু মধ্য সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অংশীদার।

অনেক মুসলিম রাষ্ট্র এখন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত।

একসময় যারা ইহুদিদের সাথে কোন ধরনের সম্পর্ক স্থাপনকে চরম নীতি বিবর্জিত ও গর্হিত কাজ মনে করত, আজ সেখানে এই সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে গর্বিত ভাব প্রদর্শন করে। ইজরায়েলের ছায়া তলে আশ্রয় গ্রহণকে চরম নিরাপদ মনে করে।

সার্বিক বিবেচনা।

উপসংহার টানতে গেলে বলতে হয় এই যুদ্ধের চ্যাম্পিয়ন পক্ষ হলো ইজরায়েল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্। এই যুদ্ধের পরাজিত অংশের দোসর হলেও এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক সবদিকেই তারা বিজয়ী ও লাভবান।

পক্ষান্তরে, যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক অধিপত্যে উইন-উইন ইমেজ গঠন করলেও এই ক্ষেত্র রাজনৈতিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও তেমন কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক ফায়দা হাসিল করতে পারবে না বলে ই মনে হয়।

সার্বিক বিবেচনায় এই যুদ্ধের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হল ইয়েমেন আর তার জনগণ।

হুতিরা সামরিক ভাবে জয়লাভ করলে ও বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত জনপদ তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

অবশেষে সর্বশক্তিমান পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করিঃ
– হে আল্লাহ তুমি এই বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত ইয়েমেনী দের সাহায্য করো, উদ্ধার করো, রক্ষা করো। পৃথিবীর সকল মানুষকে নিরাপদে রাখো। আমিন। সুম্মাহ আমিন।

লেখক। ব্যাংক কর্মকর্তা।

সাবেক শিক্ষার্থী। লোকপ্রশাসন বিভাগ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments
এ জাতীয় আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

স্বত্ব সংরক্ষিত © 2020-2021 চুনারুঘাট
কারিগরি Chunarughat
Don`t copy text!